একজন রোগীর সঠিক চিকিৎসার জন্য সঠিক রোগ নির্ণয় অত্যন্ত জরুরী। আর সঠিক রোগ নির্ণয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন একজন মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট।

বর্তমান মহামারি করোনাভাইরাস মোকাবিলা সামনের সারির যোদ্ধাদের মধ্যে অন্যতম একজন মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট। করোনাভাইরাসের উপসর্গ আছে এমন রোগীর স্যাম্পল সংগ্রহ এবং পরীক্ষা করার মত গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেন একজন মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট। ইতোমধ্যে এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আইইডিসিআরের চারজন মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট আক্রান্ত হয়েছেন।

এছাড়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর পর্যবেক্ষনের জন্য এক্স-রে, সিটি স্ক্যান এর মত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোও করেন একজন মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট। ইতোমধ্যে আমরা জানতে পেরেছি করোনাভাইরাস প্রধানত রোগীর ফুসফুস আক্রমণ করে ফলে রোগীর তীব্র শ্বাস কষ্ট হয় এজন্য ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হয়। এমতাবস্থায় ব্রিদিং এক্সরসাইজসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে রোগীর শ্বাসকষ্ট কমিয়ে আনা সম্ভব। এমনকি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে ভেন্টিলেটরের অপ্রতুলতা দেখা দিলে একজন মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) ভেন্টিলেটরের বিকল্প হিসাবে কাজ করতে পারেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, রোগ নির্ণয়ে এই সামনের সারিব যোদ্ধারাই স্বাস্থ্যখাতে সবচেয়ে অবহেলিত। ২০০৮ সালের পর দেশে কোনো মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট নিয়োগ হয়নি, নতুন কোনো পদও সৃষ্টি হয়নি। ২০১৩ সালে ৫৩০ টি পদের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কিন্তু আজ পর্যন্ত নিয়োগ হয়নি। ২০০৮ সালের পর থেকে দেশে অনেকগুলো নতুন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল তৈরী এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপালগুলোতে বেড সংখ্যা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি ডাক্তার, নার্সসহ অন্যান্য জনবল নিয়োগ করলেও মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট নিয়োগ হয়নি। ফলে হাজার হাজার মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট বেকার জীবন যাপন করছে। WHO এর নীতিমালা অনুযায়ী হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলোজিস্টের যে অনুপাত হওয়ার কথা বাংলাদেশে সে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দেশের হাসপতালগুলোতে ডাক্তার ও নার্সের তুলনায় মেডিকেল টেকনোলোজিস্টের সংখা খুবই নগণ্য। যার মাসুল দিচ্ছেন দেশের সাধারণ মানুষ যারা সঠিক রোগ নির্ণয়ের অভাবে সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বর্তমানে এই করোনাভাইরাস পরীক্ষার ধীরগতির অন্যতম কারন মেডিকেল টেকনোলোজিস্টের অভাব।

নতুন পদ তৈরী করে WHO এর নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগ প্রদান এবং ২০১৩ সালের নিয়োগ চালু করলে দেশের মানুষ সঠিক রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে সঠিক চিকিৎসা পাবে এবং করোনাভাইরাসের মত মহামারী মোকাবেলা সহজ হবে।
উল্লেখ্য দেশে মোট ১৩ টি সরকারি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) এবং অনেকগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেগুলো থেকে প্রতি বছর ল্যাবরেটরি মেডিসিন, রেডিওলোজী এন্ড ইমেজিং, ডেন্টাল, রেডিওথেরাপি, ফিজিওথেরাপি ও ফার্মেসি বিভাগের হাজার হাজার মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট বের হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এবং কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিকেল টেকনোলোজিস্টদের উচ্চশিক্ষার জন্য চার বছর মেয়াদি বিএসসি কোর্স চালু রয়েছে।

ইতোমধ্যে ঐ সকল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন, যারা বর্তমান বিশ্বের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিকতর উন্নত ও আধুনিক সেবা প্রদানে সক্ষম। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এখন পর্যন্ত গ্রাজুয়েট মেডিকেল টেকনোলোজিস্টদের জন্য কোনো পদ সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে দক্ষ জনবল থাকা স্বত্তেও দেশের সাধারণ মানুষ উন্নত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

গ্রাজুয়েট মেডিকেল টেকনোলোজিস্টদের (রেডিওলোজী এন্ড ইমেজিং) সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি অব রেডিওলোজী এন্ড ইমেজিং টেকনোলোজিস্ট এর সভাপতি মোঃ সারোয়ার হোসেন জানান, “রোগ নির্ণয়ের মত এমন স্পর্শকাতর জায়গাগুলো দুর্বল করে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন যাবৎ যা খুবই দুঃখজনক। বর্তমান সংকট কাটিয়ে স্বাস্থ্যখাতকে এগিয়ে নিতে মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট নিয়োগ, গ্রাজুয়েট মেডিকেল টেকনোলোজিস্টদের পদ সৃষ্টি এবং নিয়োগের ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”.

মোঃ মোজাম্মেল হোসেন রাসেল
বি,এস,সি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট।
রেডিওলজি এন্ড ইমেজিং, ঢাকা।